নবীগনের গল্প

হযরত আদম (আঃ) এর জীবন কাহিনী

আল্লাহ তাআলা তার সকল ফেরেশতাদের ডেকে বললেন, আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি। এ কথা শুনে ফেরেশতাগণ বললেন, আপনি কি এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্তুতি ও পবিত্রতা ঘোষণাকারী।তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, আমি যা জানি তোমার তা জানো না।




মানুষ জাতি ও জীন জাতির পূর্বে আল্লাহ তায়ালা হীন ও বিন জাতিকে সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তারা পরস্পর বিরোধ, কলহ ও প্রবঞ্চনায় মেতে ওঠে। যার দরুন খোদা তায়ালা তাদের উপর ক্রুদ্ধ হন এবং জীনদের সৃষ্টি করেন। এরপর থেকে হীন ও বিন জাতিকে বিলুপ্ত করে দেয়া হয় আর তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয় জিন জাতিকে।

কিন্তু তারাও খুব বেশি দিন হেদায়েতের পথে টিকে থাকতে পারল না। শুরু হলো রক্তপাত, বিরুদ্ধ ও বিভক্তি। বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও বাঁধলো পরস্পরের মাঝে। আল্লাহ তাআলা আবার একবার ক্রূদ্ধ হলেন। এবার তিনি তার নিষ্পাপ ফেরেশতাদের পাঠালেন। যারা এসে ধুলার সাথে মিশিয়ে দিলেন গোটা জীন জাতি। তবে একটি ছোট্ট বাচ্চা জিন ফেরেশতাদের নজর কাড়ে, তাঁরা তাকে হত্যা করতে পারল না, বরং নিয়ে আসলো ঊর্ধ্ব আকাশে। বাচ্চা জীনে ঊর্ধ্ব আকাশে এসে আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্য নিজ সত্তার বিলিন করে দেয়,আর কালের পরিক্রমায় হয়ে উঠে সাইয়্যিদুল মালায়েকা বা ফেরেশতাদের সরদার।




এই সকল ঘটনার ফলস্রুতিতে ফেরেশতাগণ ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন যে, আদম সন্তান অশান্তি ও রক্তপাতের কারণ হবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বললেন,  আমি যা জানি তোমার তা জানো না।

আল্লাহ তাআলা দুনিয়া থেকে মাটি নেন এবং তাতে পানি দিয়ে কাদা তৈরি করেন, এরপর সেই কাদায় আকৃতি দিয়ে শুঁকাতে দেওয়া হয়,তাপ প্রয়োগ করে কালো রঙ্গে পরিবর্তিত করা হয়। এবং সর্বশেষ রুহ ফুঁকে দিয়ে সম্পন্ন করা হয় প্রথম মানবের সৃষ্টিকার্য। অস্তিত্বে আসে মানবজাতির পিতা আদম আ.।  




আদম আ. কে সৃষ্টি করার পর পরই আল্লাহ তাআলা তার শ্রেষ্ঠত্বের একটি প্রমাণ দিতে চাইলেন, 

তাই তিনি আদম আ. কে কিছু জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন। এরপর তিনি সকল ফেরেশতাদের একত্রিত করে জিজ্ঞাসা করলেন এগুলোর নাম বল। কিন্তু কেউ বলতে পারল না। পরিশেষে আল্লাহ তায়ালা আদম আ. কে জিজ্ঞাসা করে বললেন,’’তুমি বল’’। আদম আ. সঙ্গে সঙ্গেই সবগুলো জিনিসের নাম বলে দেন। তখন আল্লাহ তাআলা আবার ফেরেশতাদের উদ্দেশ্য করে বলেন ,’’আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আমি যা জানি তোমরা তা জানো না’’। 




ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আলাই সাল্লাম কে এমনসব জিনিসের নাম শিক্ষা দিয়েছেন যার দ্বারা মানুষ পরিচিতি লাভ করে থাকে। যেমন মানুষ, জীব, ভূমি, স্থলভাগ ও  জলভাগ, পাহাড় পর্বত, উট-গাধা ইত্যাদি। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে   থালা-বাসন থেকে আরম্ভ করে  অধঃবায়ু নির্গমন এর নাম পর্যন্ত শিক্ষা দেন। মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহ তাকে সকল জীব-জন্তু পশু-পাখি ও সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন।

 সায়ীদ ইবনে যুবায়ের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এবং  কাতাদা  রাহিমাহুল্লাহ প্রমূখ এরূপ বলেছেন। রাবি বলেন আল্লাহ তাআলা তাকে ফিরিশতাগণের নামসমূহ শিক্ষা দেন। আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন আল্লাহ তাকে তার সন্তানদের নাম শিক্ষা দিয়েছেন। তবে সঠিক কথা হল আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে ছোট বড় সকল বস্তু ও তার গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্য শিক্ষা দেন। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এদিকে ইঙ্গিত করেছেন।




হযরত আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম কে আল্লাহ তাআলা চারটি মর্যাদা দান করেন ঃ (১) তাকে নিচে পবিত্র হাতে সৃষ্টি করা 

(২) তার মধ্যে নিজের রুহ থেকে সঞ্চার করা  

(৩) তাকে বস্তু নিচয়ের নাম শিক্ষাদান করা 

(৪) ফেরেশতাগণ কে তাকে সিজদা করার আদেশ  করা

যখন হযরত আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এর শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফিরিশতাগণের সামনে উন্মোচিত হলে, আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'য়ালা ফেরেশতাদেরকে হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম কে সম্মান প্রদর্শন মূলক সিজদা করতে  আদেশ করলেন। (তবে সেই  সিজদা আমাদের মত ছিলনা যেমনটা আমরা  নামাজে পড়ে থাকি , বরং তা কিছুটা রুকুর মত ছিল।)  আল্লাহ তাআলার আদেশে সকল ফেরেশতা হযরত আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম কে সিজদা করলেন, কিন্তু সেই বাচ্চা  জিনটি যাকে ফেরেশতাগণ ঊর্ধ্ব আকাশে নিয়ে এসেছিলেন এবং সে তার এবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য হাসিল করতে পেরেছিল, সে তার অহমিকায় অন্ধ হয়ে গেল সে হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম কে সিজদা তো করলই না বরং সে বলল আমি তার থেকে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তাআলা সেই বাচ্চা জিন তথা  ইবলিশ কে তার এই অহমিকার জন্য বিতাড়িত করলেন এবং জান্নাত থেকে বহিষ্কার করলেন। জান্নাত থেকে বের হয়ে আসার সময় ইবলিশ এই মানব জাতিকে ধ্বংস করায়    দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।




সুদ্দী আবু সালেহ ও আবু মালিকের সূত্রে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে এবং মুররা এরসূত্রে ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, তারা বলেন আল্লাহ তাআলা ইবলিশ কে জান্নাত থেকে বের করে দেন। আদম আলাইহিস সালাতু সালাম কে জান্নাতে বসবাস করতে দেন। আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম তথায় নিঃসঙ্গ একাকী বেড়াতে থাকেন। সেখানে তার স্ত্রী নেই, যার কাছে একটু শান্তি লাভ করা যায়। একসময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। জাগ্রত হয়ে দেখতে পেলেন যে, তার শিয়রে একজন নারী উপবিষ্ট রয়েছেন। আল্লাহতালা তাকে আদম আলাইহিস সালাতু সালামের পাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করেন। দেখে আদম আলাইহিস সালাতু সালাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে হে? তিনি বললেনঃ আমি একজন নারী। আদম আলাই সাল্লাম বললেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? জবাবে তিনি বলেন, যাতে আপনি আমার কাছে শান্তি পান। তখন ফেরেশতাগণ আদম আলীর সালাতু সালামের জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আদম উনার নাম কি বলুন তো? আদম আলাইহিস সালাতু সালামের বললেন হাওয়া। আবার তারা জিজ্ঞেস করলে আচ্ছা হাওয়া নাম হল কেন? আদম আলাইহিস সালাতু সালাম বললেন, কারণ তাকে, “হাই” (জীবন্ত সত্তা) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

 মুহাম্মদ ইবনে  ইসহাক (র.) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, হাওয়াকে আদম আলাইহিস সালাতু সালাম-এর বাম পাজরের সবচাইতে ছোট হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তখন আদম আলাইহিস সালাতু সালাম ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। পরে সে স্থানটি আবার গোশত দ্বারা পূরণ করে দেওয়া হয়।




আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এবং হযরত হাওয়া আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম কে জান্নাতুল খুলদে প্রবেশ করিয়ে দেন। এবং তাদেরকে বলেন, তোমরা এখানে বসবাস করতে থাক, তোমাদের যা ইচ্ছা তাই তোমরা  উপভোগ করতে পারবে,  তবে শুধুমাত্র এই গাছটির নিকটবর্তী হতে পারবে না। যদি হও তবে তোমরা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

হযরত আদম ও হাওয়া আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম জান্নাতে বেশ সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন। কিন্তু ইবলিশের সেই সুখ সহ্য হলো না। সে প্রথমে হযরত হাওয়া আলাইহিস সালাতু সালাম কে প্ররোচিত করল। হাওয়া আলাইহিস সালাতু সালাম  হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম কে রাজি করালেন, এবং সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করলেন । ফল ভক্ষণ এর সাথে সাথেই আদাম এবং হাওয়া আলাইহিস সালাতু সালামের মলমূত্র ত্যাগ হয়ে গেল, জান্নাতি পোশাক শরীর থেকে খুলে নিচে পড়ে গেল ঠিক সে সময়ে হযরত আদম এবং হাওয়া আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম অনুধাবন করতে পারবেন যে, তারা আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলার আদেশ অমান্য করেছেন, তাই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের এই অপরাধ এত সহজে ক্ষমা  করলেন না। বরং তাদের কে পৃথিবীতে  বিক্ষিপ্তভাবে পাঠিয়ে  দিলেন। আদম আ.কে সরনদীপে (শ্রীলংকা) ও হাওয়া কে জেদ্দায় (সউদি আরব) পাঠানো হয়েছিলো।




 চরণ দ্বীপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর আদম আলাইহিস সালাতু সালাম দীর্ঘ ৪০ বছর পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে  গুনাহ মাফ করার জন্য কান্নাকাটি করতে থাকেন। অন্য এক  রেওয়ায়েতে পাওয়া যায় তিনি দীর্ঘ তিনশ বছর কান্নাকাটি করেছিলেন। পরিশেষে একদিন জিবরীল আলাইহিস সালাতু সালাম আদম আলাইহিস সালাতু সালাম এর কাছে আসলেন, এবং বললেন মৃত্যুর আগে হজ করে  নিন ।একথা শুনে আদম আলাইহিস সালাতু সালাম বাইতুল্লাহ এর দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এবং এক পর্যায়ে  জেদ্দা এসে পৌঁছান। সেখানে তিনি বেশ অনেক সংখ্যক ফেরেশতাদের কে বাইতুল্লাহ শরীফ কে তাওয়াফ করতে দেখেন।  ফেরেশতাগণ হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম-কে স্বাগত জানান, এবং সালাম বিনিময় করেন। 

আরাফার ময়দানে হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম হযরত হাওয়া আলাইহিস সালাতু সালামের দেখা পান, একে অপরকে দেখা মাত্রই তারা পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেন। এবং উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকেন। তাদের এমন আবেগপ্রবণ দৃশ্য দেখে ফেরেশতাগণও  কাঁদতে শুরু করেন। পরিশেষে হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  এর নামের উসিলায় আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলার দরবারে ইস্তেগফার করেন। এবং আল্লাহ সুবহানাতায়ালা হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম এবং হাওয়া আলাই সালাম এর   ইস্তেগফার কবুল করেন ।




এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেনঃ







قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ 

‘তারা উভয়ে বলল, হে আমাদের রাব্ব! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, আপনি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি রহম না করেন তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়বো। [সূরা আ‘রাফ : ২৩]।

উবাই ইবনে কাব (রা) সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমাদ যিরাদাতে বর্ণনা করেন যে, উবাই ইবনে কাব (রা) বলেছেন মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আদম আলাইহিস সালাতু সালাম এর জান্নাতের আঙ্গুর খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হলে তার সন্তানরা আঙ্গুরের সন্ধানে বের হয়। পথে তাদের সঙ্গে ফেরেশতাগণের সাক্ষাৎ ঘটে। তারা জিজ্ঞাসা করেন, হে আদমের সন্তানেরা তোমরা যাচ্ছো কোথায়? তারা বললেন আমাদের পিতা জান্নাতের এক ছড়া আঙ্গুর খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ফেরেশতাগণ বললেন তোমরা ফিরে যাও। তোমরা তাঁর জন্যে যথেষ্ট করেছ। আর দরকার নেই। অগত্যা তারা আদম আলাইহিস সালাতু সালাম এর নিকট ফিরে গেলেন।

হযরত আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম হাওয়া আলাইহিস সালাতু সালামের  উড়াতে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে,  এমন সময় হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাতু সালাম এবং আজরাইল আলাইহিস সালাতু সালাম গৃহে প্রবেশ করলেন। হযরত হাওয়া আলাইহিস সালাতু সালাম কাঁদতে শুরু করলেন। কিন্তু আদম আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম এর জন্য তার সৃষ্টিকর্তা পরম বন্ধু অপেক্ষা করছেন। ফেরেশতাগণ আদম আলাইহিস সালাতু সালামের রুহ কবজ করে গোসল দিয়ে সুগন্ধি মাখিয়ে তাকে কাফন পরিয়ে দেন। এরপর অন্যান্য ফেরেশতাদেরকে নিয়ে জিবরাঈল আলাইহিস সালাতু সালাম তার জানাযার নামায আদায় করে তাকে দাফন করে দেন।





One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *